পঞ্চগড়ের বোদা থানা নিবাসী মরহুম সিরাজুল ইসলাম ও মমিরন নেছার কন্যা উম্মে কুলসুম ছোট থেকে দিনাজপুর শহরের চারুবাবুর মোড়ে চাচা মরহুম ফজলুল ওয়াহেদের বাড়িতে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে এ বাড়িতে থেকেই তিনি স্বারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন ২৭/২৮ বছরের অবিবাহিতা তরুনী ছিলেন তিনি। ছোট বোন আনোয়ারা বেগম অসুস্থ্য হলে তাকে দেখা শোনার জন্য ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গোলকুঠিতে ছোট বোনের বাড়িতে যান। সেখানে অবস্থানকালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তিনি ছোট বোনের সাথে হামজাপুর-খানপুর হয়ে ভারতের গঙ্গাঁরামপুরে পালিয়ে যান। গঙ্গারামপুরে তিন মাস থাকার পর জুন মাসে গিয়ে ধলদির্ঘী এলাকায় ওঠেন।
ধলদির্ঘীতে থাকার সময় তার পুর্ব পরিচিত হাজি মোহাম্মদ দানেশের (তেভাগ আন্দোলনের নেতা) সাথে একদিন দেখা হয়। হাজী দানেশ ছিলেন তার ফুপাত বোন ফলিজাতুননেছার স্বামী। সেই সূত্রে তিনি সম্পর্কে হাজি দানেশের শ্যালিকা ছিলেন। হাজি দানেশ তাকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে বললে তিনি রাজী হন। কারণ যে কোন একটি কাজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে শরীক হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার।
কাজের প্রথম পর্যায়ে উম্ম কুলসুম বালুরঘাট হাসপাতালে আহত রোগীদের সেবা দানের কাজ করতেন। রোগীর সুশ্রষা করা, ইনজেকশন দেয়া, ঔষধ খাওয়ানো ছিল তার কাজ। প্রায় তিন মাস রোগীর সেবার পর তাকে অন্ত্র বহনের কাজ দেয়া হয়। হাজি দানেশ নিজেই তাকে এই কাজ করতে বলেন। কাজ শুরুর আগে তাকে শপথ নিতে হয় যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতামূলক কোন কাজ করবেন না।
বালুরঘাট হাসপাতাল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে গ্রেনেড বা বিস্ফোরোক রেখে হাঁড়ির মুখ কলাপাতা শালপাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। হাঁড়ির গলা দড়ি দিয়ে বাঁধা হতো ঝুলিয়ে নেয়ার সুবিধার জন্য। ঠিক যেভাবে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে যায়, সেভাবে গ্রেনেডের হাঁড়ি নিয়ে গেতেন উম্ম কুলসুম। হাজী দানেশ তাকে অস্ত্র বহনের কাজ দিয়েছিলেন। প্রথম যখন তাকে একাজ দেয়া হয়, তখন হাজী দানেশের সাথে শাহ মাহতাব এমপি (চিরিরবন্দর-খানসামা), আজগর আলী সহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তারা সবাই উম্মে কুলসুমকে বলেন, সাবধানে কাজ করবে। এমন ভাবে কাজ করবে যেন আমাদের সম্মান থাকে।
উম্মে কুলসুম প্রায় আড়াই মাস অস্ত্র বাহকের কাজ করেন। তিনি বালুরঘাট হাসপাতাল থেকে অস্ত্র নিয়ে পায়ে চপ্পল, চোখে পশমা এবং সাধারন কাপড় পড়ে প্রায় আড়াই-তিন মাইল দুরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্রের হাঁড়ি তুলে দিতেন। সপ্তহে দুই থেকে তিন দিন একাজ করেতেন। এমন ভাবে তিনি হাঁড়ি নিয়ে যেতেন যেন কেউ তাকে সন্দেহ করতে না পারে। মিষ্টি নিয়ে আত্মীয় বাড়িতে যাচ্ছেন এমন একটা ভাব নিয়ে তিনি অস্ত্র বহনের কাজ করতেন। হাঁ িতে কি অস্ত্র থাকত তা বলে দেয়া হতো তাকে। হাঁড়ি পড়ে গেলে বিস্ফোরণ হতে পারে, তাতে তার মৃত্যুও হতে পারে এমন সতর্কবানী তাকে হাঁড়ি দেয়ার সময়ই করা হতো। কিন্তু মৃত্যু ঝুঁকি সত্বেও সুচারুভাবে তিনি তার দায়িত্ব পালন করতেন। দৃর্ভাগ্য হালো যুদ্ধ শেষে অনেক অমুক্তিযোদ্ধার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় উঠে এলেও উম্মে কুলসুমের নাম কখনো তালিকাভুক্ত হয়নি। তাই রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত তিনি। উম্মে কুলসুম জানান, যুদ্ধ শেষে তাকে ভারত থেকে একটি সনদ পত্র দেয়া হয়েছিল, যা তিনি মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সংগঠক আওয়ামী লীগ নেতা এম আব্দুর রহিমকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় ওই সাটিফিকেটের বিষয়ে রহিম সাহেব তেমন আগ্রহ দেখান নি। সাটিফিকেটটি আদৌ কোন কাজে লাগবে কিনা সে বিষয়ে তিনি সচেতনও ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম তৎপরতা শুরু হলে তিনি ভয় পেয়ে সাটিফিকেটটি পুড়িয়ে ফেলেন। অথচ তিনি যে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন, তা মরহুম মুক্তিযোদ্ধা জজ ভাই জানতেন। পাটুয়াপাড়ার বীরমুক্তিযোদ্ধা মাতু ভাইও জানেন।
অবিবাহিত উম্মে কুলসুমের নিকটত্মীয় বলতে কেউ নেই। একাকী জীবন নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে প্রায় নির্জন বসবাস করছেন দিনাজপুর শিল্প ও বনিক সমিতি ভবনের সামনে সেলিনা হাইয়ের বাসায়। তিনি মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অস্ত্র পৌঁছাতেন দেশ স্বাধীন হবে বলে। কিন্তু স্বাধীন দেশে এখন তার অন্ন বস্ত্রের নিশ্চয়তা নেই! মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই তার নাম!
তথ্যসূত্রঃ দিনাজপুরনিউজ ডট কম


